শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২৬ - ১০:৪২
সন্তানদের নামাজ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ

অনেক বাবা-মায়েরই এমন উদ্বেগ থাকে—সন্তান ভদ্র ও সদাচারী হওয়া সত্ত্বেও নামাজ আদায়ে কেন গড়িমসি করে? হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন উস্তাদ তারাশিউন মনে করেন, এর পেছনে বাবা-মায়ের সন্তান প্রতিপালনের পদ্ধতি এবং অপ্রয়োজনীয় কঠোরতা অন্যতম কারণ।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র নিয়মিত আয়োজনে সন্তান ও পরিবার প্রতিপালন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন তারাশিউন সন্তানদের নামাজে অনীহার কারণ ও তা দূর করার কিছু উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।

প্রশ্ন: আমার একটি সন্তান আছে। আলহামদুলিল্লাহ, সে খুবই ভদ্র। কিন্তু নামাজের সময় হলেই গড়িমসি করে এবং নামাজ পড়ে না।

সন্তানদের নামাজ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ

উত্তর: অনেক বাবা-মা উদ্বিগ্ন থাকেন যে, সন্তান ভদ্র ও সদাচারী হওয়া সত্ত্বেও নামাজ আদায়ে কেন অবহেলা করছে। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো নামাজ আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত কঠোরতা।

নামাজ ওয়াক্তের শুরুতেই আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও উত্তম। তবে এমনভাবে বিষয়টি সন্তানের সামনে উপস্থাপন করা উচিত নয় যে, ওয়াক্তের শুরুতে তার নামাজ পড়ার মতো মন-মানসিকতা না থাকলে এবং কিছুটা দেরিতে নামাজ আদায় করলে সেই নামাজের আর কোনো মূল্য নেই। অবশ্যই নামাজের একটি ফজিলতের সময় রয়েছে এবং ওয়াক্তের শুরুতে আদায় করলে সওয়াব বেশি। তবে বিষয়টি সন্তানকে বিচক্ষণতার সঙ্গে বোঝাতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামাজ আদায়ের ধরন। শিশু-কিশোরদের ধৈর্য ও মনোযোগ অনেক সময় বড়দের মতো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে রুকু-সিজদা করতে তাদের ধৈর্যচ্যুতি বা অনীহা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের একটি স্নেহপূর্ণ কথা অনেক সময় সমস্যার সমাধান করতে পারে। যেমন সন্তানকে বলা যেতে পারে, “নামাজের ফরজগুলো আদায় করলেই যথেষ্ট।”

মুস্তাহাব আমলগুলো পালন করলে অবশ্যই অতিরিক্ত সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয়। কিন্তু সন্তান যখন সময়ের সংকটে থাকে বা নামাজের প্রতি অনীহা বোধ করে, তখন তাকে প্রথমে ফরজগুলো আদায়ে উৎসাহিত করা—নামাজ দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে পুরোপুরি নামাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে অনেক ভালো।

তাই প্রতিটি মুস্তাহাব আমল পালনে জোর দেওয়া, দীর্ঘ কুনুত বা অতিরিক্ত জিকিরের ওপর গুরুত্বারোপ করে কিশোর-কিশোরীদের কাছে নামাজকে কঠিন ও ক্লান্তিকর করে তোলা উচিত নয়।

এর পাশাপাশি সন্তানদের মধ্যে নামাজের দর্শন ও তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। তাদের মনে নামাজের অবস্থান যেন আমরা পরিবর্তন না করে দিই। যেমন, নামাজকে শুধু পার্থিব কোনো লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়—যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা বস্তুগত সাফল্য অর্জনের জন্য নামাজ পড়তে হবে। কারণ সন্তান কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে তার মধ্যে ধর্মের প্রতি বিরূপতা তৈরি হতে পারে। নামাজ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি ইবাদত এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার এমন এক সম্পর্ক, যা পার্থিব লাভ-ক্ষতির হিসাবের ঊর্ধ্বে।

দুঃখজনকভাবে, আমাদের অনেক প্রাপ্তবয়স্কেরই নামাজের গভীর রহস্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে যথেষ্ট উপলব্ধি নেই। সেখানে সন্তানদের কাছে এসব বিষয় যথাযথভাবে তুলে ধরা আরও কঠিন। ইসলামী জ্ঞানী ব্যক্তিরা ‘আসরারুস সালাত’ বা ‘নামাজের রহস্য’ বিষয়ে মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর রচনা থেকে শুরু করে উস্তাদ কারায়াতি ও আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলির বিভিন্ন গ্রন্থ এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। এসব বই অধ্যয়ন করলে নামাজ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীদের উপযোগী ভাষায় নামাজের তাৎপর্য ও রহস্য বোঝানোর জন্য ‘পার-এ পারভাজ’-এর মতো বইও রয়েছে, যা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

সবশেষে, সন্তানদের নামাজের প্রতি আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত করার দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণমূলক ও শিক্ষামূলক বই পড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেমন, ‘অগাজে বারায়ে পারভাজ’ বইটিতে সন্তানদের নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করার শতাধিক পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ছুটির সময়ে সপ্তাহে কয়েক ঘণ্টা এ ধরনের বই পড়ার জন্য ব্যয় করা হলে সন্তান প্রতিপালনে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং সন্তানদের আধ্যাত্মিক বিকাশে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha